ইসলাম কেবল ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা—সব ক্ষেত্রেই ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভোটাধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক অধিকার। প্রশ্ন হলো—ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট দেওয়া কি শুধু নাগরিক অধিকার, নাকি এটি একটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও?
ইসলাম রাষ্ট্র পরিচালনায় শূরা বা পরামর্শকে মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন—
وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ
“তাদের কার্যাবলি পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।”
(সূরা আশ-শূরা: ৩৮)
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, সমাজ ও রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত এককভাবে নয়, বরং জনগণের অংশগ্রহণ ও মতামতের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। আধুনিক প্রেক্ষাপটে ভোট হলো সেই মতামত প্রকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
ইসলামী দৃষ্টিকোণে ভোট দেওয়া নিছক একটি রাজনৈতিক কাজ নয়; এটি সাক্ষ্য (শাহাদাহ) দেওয়ার শামিল। আপনি যাকে ভোট দিচ্ছেন, কার্যত তার যোগ্যতা, আমানতদারিতা ও নেতৃত্বের পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছেন।
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
وَلَا تَكْتُمُوا الشَّهَادَةَ ۚ وَمَنْ يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ آثِمٌ قَلْبُهُ
“সাক্ষ্য গোপন করো না। যে তা গোপন করে, তার হৃদয় পাপী।”
(সূরা আল-বাকারা: ২৮৩)
যেখানে একজন অযোগ্য ব্যক্তিকে ক্ষমতায় আনা সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, সেখানে ভোট না দেওয়া বা ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া সাক্ষ্য গোপন বা বিকৃত করার মতো অপরাধে পরিণত হতে পারে।
নেতৃত্ব ইসলামি শরিয়তে একটি আমানত। কুরআনে বলা হয়েছে—
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন, আমানত তার প্রকৃত হকদারের কাছে পৌঁছে দিতে।”
(সূরা আন-নিসা: ৫৮)
ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই আয়াত অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যোগ্য, সৎ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া আমানত আদায়ের অন্তর্ভুক্ত; আর অযোগ্যকে ক্ষমতায় বসানো আমানতের খেয়ানত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নেতৃত্বের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন—
إِذَا وُسِّدَ الْأَمْرُ إِلَىٰ غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ
“যখন দায়িত্ব অযোগ্যদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করো।”
(সহিহ বুখারি)
এই হাদিস স্পষ্ট করে দেয়—নেতৃত্ব নির্বাচন কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়। ভোটের মাধ্যমে যদি অযোগ্যদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়, তার দায় সমাজের ওপর বর্তায়।
ভোট দেওয়া ব্যক্তিভেদে ফরজে আইন, ফরজে কিফায়া বা ওয়াজিবের পর্যায়ে যেতে পারে—বিশেষত যখন ভোট না দিলে অনাচার, জুলুম বা অযোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক সমকালীন আলেমের মতে, এমন পরিস্থিতিতে ভোট দেওয়া নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
ইসলামে ভোট কোনো পাশ্চাত্য ধারণার অনুকরণ নয়; বরং এটি শূরা, সাক্ষ্য, আমানত ও ন্যায়ের ইসলামী মূলনীতিরই আধুনিক রূপ। সচেতনভাবে, দায়িত্ববোধ থেকে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে ভোট দেওয়া একজন মুসলমানের জন্য ইবাদতের মর্যাদা পেতে পারে। আর অবহেলা, উদাসীনতা বা স্বার্থপরতার কারণে ভোটের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া সমাজের জন্য ক্ষতিকর এবং আত্মিক জবাবদিহির কারণ হতে পারে।