সোমবার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়ের হওয়া মামলাগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। নিরীহ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন এবং আইনের শাসন নিশ্চিত হয়—এ লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পদায়ন প্রক্রিয়া, অস্ত্রের লাইসেন্স, পাসপোর্ট সেবা এবং পুরোনো বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৫ আগস্টের পর বেশ কিছু মামলা হয়েছে, যার মধ্যে কিছু ‘সুবিধাবাদী’ মহলের করা। অনেক ক্ষেত্রে নিরপরাধ ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, সমাজের বিশিষ্টজন ও সাংবাদিকদের নামও মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব মামলা পরীক্ষা করে পুলিশ সরকারকে প্রতিবেদন দেবে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, পুলিশের কাজে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না। কেউ বৈধ দায়িত্ব পালনে বাধা দিলে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ওসি ও এসপি পদায়নে লটারি পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের চেইন অব কমান্ড শক্তিশালী করতে হবে। যোগ্যতা, দক্ষতা ও সার্ভিস রেকর্ডের ভিত্তিতে পদায়ন করা হবে। লটারি পদ্ধতির স্বচ্ছতা নিয়ে অতীতে প্রশ্ন ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক কারণে প্রটোকল দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এখন থেকে বিধির বাইরে কাউকে প্রটোকল দেওয়া যাবে না।
২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহ পুনঃতদন্তে কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে প্রয়োজন হলে নতুন তদন্ত কমিশন গঠন করে প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিন মেয়াদে দেওয়া অস্ত্রের লাইসেন্সগুলো পুনরায় যাচাই করা হবে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, লাইসেন্সধারীরা যোগ্য ছিলেন কি না—এসব খতিয়ে দেখা হবে। রাজনৈতিক বা অপরাধমূলক উদ্দেশ্যে দেওয়া লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
মন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনার পরও প্রায় ১০ হাজার বৈধ অস্ত্র এখনো জমা পড়েনি। সেগুলো শনাক্ত করে উদ্ধার করা হবে, প্রয়োজনে মামলা করা হবে।
স্থায়ী ঠিকানা জালিয়াতির মাধ্যমে কনস্টেবল পদে নিয়োগের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে ২ হাজার ৭০১টি কনস্টেবল পদ শূন্য রয়েছে—দ্রুত নিয়োগ দেওয়া হবে।
এছাড়া ২০০৬ সালে চাকরি হারানো প্রায় ৬৩০ জন পুলিশ সদস্য এবং সে সময় নিয়োগ বাতিল হওয়া প্রায় ৭৫০ জন এসআই ও সার্জেন্টের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে আদালতে সারসংক্ষেপ পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।
পাসপোর্ট সেবায় ভোগান্তি কমাতে নিবন্ধিত সেবা-সহায়ক চালুর পরিকল্পনার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রাথমিকভাবে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরে এই ব্যবস্থা চালু হবে। নির্ধারিত সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে নিবন্ধিত ব্যক্তিরা আবেদন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবেন।
মব ভায়োলেন্স বা মহাসড়ক অবরোধের মাধ্যমে দাবি আদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বৈধ দাবি থাকলে তা আইনসম্মত উপায়ে উত্থাপন করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী জনগণের প্রত্যাশা পূরণে প্রশাসনকে নতুন উদ্যমে কাজ করতে হবে। তিনি বিভিন্ন বিভাগে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে দিকনির্দেশনা দেবেন বলেও জানান।
বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক, র্যাব, বিজিবি, আনসার, সিআইডি, পাসপোর্ট অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।