১১ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বিশ্ব
সীমান্ত থেকে রাজধানীতে সংঘাতের বিস্তার

আফগান-পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি হামলা

আফগান-পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি হামলা

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক বিপজ্জনক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। শুক্রবার ভোরে পাকিস্তান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়া প্রদেশে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। ইসলামাবাদ এটিকে তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে দুই দেশের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় সামরিক মুখোমুখি অবস্থা।

পাকিস্তানের হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে আফগান বাহিনী ছয়টি সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পাকিস্তানি সামরিক অবস্থানে সমন্বিত আক্রমণ চালিয়েছে বলে কাবুল দাবি করে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী বহু পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং একাধিক চৌকি দখল করা হয়েছে।

তবে ইসলামাবাদ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, সীমিত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং পাল্টা অভিযানে বিপুলসংখ্যক আফগান যোদ্ধা নিহত হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “আমাদের ধৈর্য শেষ। এখন এটি আমাদের ও তোমাদের মধ্যে প্রকাশ্য যুদ্ধ।” প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেন, দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় কোনো নমনীয়তা দেখানো হবে না।

অন্যদিকে তালেবান মুখপাত্র জবিহুল্লাহ মুজাহিদ কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়ায় হামলার কথা স্বীকার করলেও প্রাণহানির তথ্য অস্বীকার করেন। তিনি জানান, কান্দাহার ও হেলমান্দ থেকে পাল্টা অভিযান শুরু হয়েছে।

গত অক্টোবরে টানা সংঘর্ষে বহু প্রাণহানির পর তুরস্ককাতার-এর মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। পরে দোহা ও ইস্তাম্বুলে আলোচনা হলেও স্থায়ী সমঝোতা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাত আগের সব উত্তেজনাকে ছাড়িয়ে গেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর কাঠামো নেই।

সাম্প্রতিক হামলা ও উত্তেজনার পটভূমি

ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের ভেতরে ধারাবাহিক আত্মঘাতী হামলার পর পরিস্থিতি তীব্র হয়। রাজধানীর একটি শিয়া মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, বাজাউর অঞ্চলে নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা এবং বান্নুতে নিরাপত্তা কনভয়ে আক্রমণের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে।

পাকিস্তানের অভিযোগ, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান নামের সশস্ত্র সংগঠন আফগান ভূখণ্ডে আশ্রয় নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্রোহ চালাচ্ছে। তালেবান সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করে।

এ ছাড়া বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি নামের আরেক সশস্ত্র গোষ্ঠীকেও পাকিস্তান আফগান ভূখণ্ডে নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে।

কৌশলের পরিবর্তন ও নতুন ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার পাকিস্তান শুধু সীমান্তবর্তী অঞ্চল নয়—কাবুল ও কান্দাহারের মতো প্রশাসনিক ও আদর্শিক কেন্দ্রকে লক্ষ্য করেছে। এটি সংঘাতের নতুন ও বিপজ্জনক ধাপ নির্দেশ করে।

তালেবানের কোনো বিমানবাহিনী নেই, তবে গেরিলা কৌশল, প্রক্সি হামলা, আত্মঘাতী আক্রমণ এবং বিস্ফোরকবাহী মানবহীন উড়োজাহাজ তাদের প্রধান শক্তি। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানান, কয়েকটি শহরে ছোট মানবহীন উড়োজাহাজ ভূপাতিত করা হয়েছে এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে পাকিস্তানের নগরাঞ্চলে সহিংসতা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উভয় দেশকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সংলাপ সহজ করতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার-এর সঙ্গে জরুরি আলোচনা করেছেন। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান-এর সঙ্গেও যোগাযোগ হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বিবৃতি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। বিশ্বাসযোগ্য তথ্য বিনিময়, যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ এবং পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুললেই কেবল উত্তেজনা প্রশমনের পথ খুলতে পারে।

এই মুহূর্তে দুই দেশই পিছু হটার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। সীমান্তের সংঘর্ষ এখন রাজধানীর আকাশে পৌঁছেছে। সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে—এমন আশঙ্কাই জোরালো হয়ে উঠছে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে।