১১ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আমিরাতে ইরানের হামলায় উদ্বেগে প্রবাসী বাংলাদেশীরা

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জেরে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা চরমে। পাল্টা হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত হেনেছে ইরান। এতে এখন পর্যন্ত তিনজন নিহত ও ৫৮ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের একজন বাংলাদেশী—সালেহ আহমদ। তিনি আজমান প্রদেশে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর বাড়ি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায়।

আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৬৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়; এর মধ্যে ১৫২টি ধ্বংস ও দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। এছাড়া ৫৪১টি ইরানি ড্রোনের মধ্যে ৫০৬টি ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম বিলাসবহুল আবাসিক এলাকা পাম জুমেইরাহ (পাম জুমেইরাহ)—দুবাইয়ের পারস্য উপসাগরে অবস্থিত একটি কৃত্রিম দ্বীপ। তিন বছর আগে এখানে একটি অ্যাপার্টমেন্ট কেনেন এক বাংলাদেশী ব্যবসায়ী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি সপরিবারে সেখানে বসবাস শুরু করেন।

গত শনিবার রাতে পাম জুমেইরাহ এলাকায় ইরান থেকে ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ইফতারের পরপরই বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং দূর থেকে আগুনের শিখা দেখা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, “বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় অন্য দেশে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পরিবার নিয়ে আতঙ্কে আছি।”

বণিক বার্তার আমিরাত প্রতিনিধি জানিয়েছেন, আবুধাবি রেসিডেন্সি এলাকা ও পাম জুমেইরাহর ফেয়ারমন্ট হোটেল (ফেয়ারমন্ট হোটেল)-এ মিসাইল হামলা হয়েছে। পাশাপাশি জাবেল আলী পোর্ট (জাবেল আলী বন্দর), দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর)-এর টার্মিনাল–৩, বুর্জ আল আরব হোটেল (বুর্জ আল আরব) এবং বুর্জ খলিফা (বুর্জ খলিফা) সংলগ্ন দুবাই মল (দুবাই মল) এলাকায় ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে।

সরকারের পক্ষ থেকে মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হচ্ছে। সবাইকে ঘরে অবস্থান ও জনসমাগম এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

দুবাইয়ে দীর্ঘদিন বসবাসরত এক ব্যবসায়ী ইকবাল মাহমুদ (ছদ্মনাম) জানান, তাঁর বাসা থেকে প্রায় ৩০০ মিটারের মধ্যে একটি ইরানি ড্রোন পড়ে। “মিসাইলের শব্দে ঘুমাতে পারছি না,” বলেন তিনি।

২০১৯ সালে বিত্তবান বিদেশীদের আকৃষ্ট করতে সংযুক্ত আরব আমিরাত গোল্ডেন ভিসা (গোল্ডেন ভিসা) চালু করে। ২ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সম্পত্তি থাকলেই আবেদন করা যেত। অনেক বাংলাদেশী ব্যাংক পরিচালক, রাজনীতিবিদ, তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার এ সুযোগ গ্রহণ করেন। তবে ২০২৪ সালের শুরুতে বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়ায় নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

২০০৯ সালের পরবর্তী ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে বলে শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, এ অর্থের একটি বড় অংশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজ (সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজ)—সংক্ষেপে সিফোরএডিএস (সিফোরএডিএস)—এর তথ্য অনুযায়ী, দুবাইয়ে ৪৬১ বাংলাদেশীর নামে ৯২৯টি নিবন্ধিত সম্পত্তি রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।

আবুধাবিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস প্রবাসীদের জন্য হটলাইন ও ই-মেইল সেবা চালু করেছে। রাষ্ট্রদূত তারেক আহমেদ জরুরি বার্তায় জানিয়েছেন, অতি প্রয়োজন ছাড়া দূতাবাসে না যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। সবাইকে বাসায় অবস্থান করে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম রেমিট্যান্স উৎস দেশ। প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশী সেখানে বসবাস করছেন। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে তাঁরা ২০৬ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৪১৭ কোটি ডলার।

বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রবাসীদের জীবনযাপন ও দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ—দুই ক্ষেত্রেই উদ্বেগ তৈরি করেছে।