১১ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ইরান প্রশ্নে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কি নতজানু?

ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে বিবৃতি দিয়েছে, তা ভাষাগতভাবে পরিমিত, কূটনৈতিকভাবে সতর্ক এবং রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটি কি যথেষ্ট? এটি কি কেবল একটি প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া, নাকি একটি রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান?

বিবৃতির শুরুতেই প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি জরুরি ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। যে অঞ্চলে লাখ লাখ বাংলাদেশী কাজ করেন, সেখানে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে সরকার উদ্বিগ্ন হবেই। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কি কেবল প্রবাসী সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি আন্তর্জাতিক ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নেও তার স্পষ্ট অবস্থান থাকা উচিত?

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান” এবং “কূটনৈতিক সমাধানে ফিরে আসার” কথা। এ ধরনের ভাষা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ কূটনীতির অংশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সংঘাত সবসময় সমান শক্তির দুই পক্ষের মধ্যে ঘটে না। যখন কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌম ভূখণ্ডে সামরিক হামলা হয়, তখন ‘উভয় পক্ষকে সংযমের আহ্বান’ অনেক সময় ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যকে আড়াল করে দেয়। এতে নীতিগত অবস্থান অস্পষ্ট থেকে যায়।

বিবৃতিতে কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা করা হয়েছে। কিন্তু হামলার উৎস বা দায় সম্পর্কে সরাসরি কোনো উল্লেখ নেই। ফলে বক্তব্যটি কৌশলী হলেও স্পষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু ভারসাম্য কখনো কখনো নীরবতার কাছাকাছি চলে যায়। তখন প্রশ্ন ওঠে—এটি কি কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, নাকি অতিরিক্ত সতর্কতা?

নতুন সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন বৈশ্বিক রাজনীতি ক্রমেই মেরুকৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা যেমন জরুরি, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি ও শ্রমবাজার সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বৈত বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি যদি কেবল অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে।

বাংলাদেশ অতীতে বহুবার আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ, নিরস্ত্রীকরণ উদ্যোগে সমর্থন কিংবা ফিলিস্তিন ইস্যুতে অবস্থান—এসবই দেখায়, বাংলাদেশ কেবল নীরব দর্শক নয়। সেই ঐতিহ্যের আলোকে বর্তমান বিবৃতিটি তুলনামূলকভাবে সংযত, এমনকি কিছুটা প্রতিরক্ষামূলক বলেই মনে হয়।

অবশ্য কূটনীতিতে উচ্চস্বরে বক্তব্য দেওয়া সবসময় ফলপ্রসূ হয় না। কখনো নীরবতা বা মৃদু ভাষাও কৌশল হতে পারে। কিন্তু কৌশল ও নীতির মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। কৌশল সাময়িক, নীতি দীর্ঘস্থায়ী। রাষ্ট্রের বক্তব্যে যদি নীতিগত দৃঢ়তা স্পষ্ট না হয়, তবে তা কেবল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ভাষণ হয়ে দাঁড়ায়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সরকারের বিবৃতি সতর্ক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং ঝুঁকি-নিয়ন্ত্রিত। তবে এটি বলিষ্ঠ বা নীতিনিষ্ঠ প্রতিক্রিয়া হিসেবে কতটা স্মরণীয় হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো—কীভাবে বাস্তববাদী স্বার্থরক্ষা ও নৈতিক অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় ঘটানো যায়। কারণ পররাষ্ট্রনীতি শুধু কূটনৈতিক ভাষার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের চরিত্রেরও প্রতিফলন।