সপ্তাহান্তে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র দোহা, দুবাই ও মানামায় আঘাত হানার পর উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে কঠিন সিদ্ধান্তের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তারা কি পাল্টা হামলা চালাবে—যার ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে একযোগে যুদ্ধ করছে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে, নাকি নীরব থাকবে—যখন তাদের শহরগুলো হামলার মুখে পড়ছে?
কাতারের রাজধানী দোহা থেকে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শুধু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মাঝেও নিজেদের স্থিতিশীল ও নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে উপস্থাপনের যে ভাবমূর্তি উপসাগরীয় দেশগুলো গড়ে তুলেছিল, সেটিও বড় ধাক্কা খেয়েছে।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবুধাবির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক মনিকা মার্কস আল জাজিরাকে বলেন, “মানামা, দোহা বা দুবাইয়ে বোমা হামলার দৃশ্য এখানকার মানুষের কাছে যেমন অস্বাভাবিক ও অকল্পনীয়, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রে শার্লট, সিয়াটল বা মায়ামিতে বোমা হামলা হলে আমেরিকানদের কাছে তা যেমন মনে হতো।”
এই হামলা ঘটে ইরানের পাল্টা অভিযানের অংশ হিসেবে। শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে ব্যাপক হামলা চালায়। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক নেতা নিহত হন। দেশটির বিভিন্ন সামরিক ও সরকারি স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু করা হয়। একটি স্কুলেও হামলা হয়, যেখানে অন্তত ১৪৮ জন নিহত হন।
এর জবাবে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত তিনজন নিহত এবং ৫৮ জন আহত হন। দুবাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও বিমানবন্দর, মানামার উঁচু ভবন এবং কুয়েতের বিমানবন্দরেও আঘাত লাগে। দোহার কয়েকটি এলাকায় ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। সৌদি আরব জানায়, রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলেও হামলা হয়েছে। কাতারে ১৬ জন, ওমানে ৫ জন, কুয়েতে ৩২ জন এবং বাহরাইনে ৪ জন আহত হয়েছেন।
যে যুদ্ধ তারা ঠেকাতে চেয়েছিল
উপসাগরীয় দেশগুলো এই সংঘাত চায়নি। হামলার আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে ওমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা মধ্যস্থতা করছিল। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি বলেছিলেন, ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত না করার এবং বিদ্যমান মজুত কমিয়ে আনার বিষয়ে সম্মত হওয়ায় শান্তি “হাতের নাগালে” ছিল।
তবে কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করে।
মনিকা মার্কস বলেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলো কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস ধরে সম্ভাব্য যুদ্ধ ঠেকাতে ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছিল, কোণঠাসা ইরান আত্মসমর্পণের বদলে আঞ্চলিক সংঘাত বাড়ানোর পথ বেছে নিতে পারে।
কিংস কলেজ লন্ডনের শিক্ষক রব গাইস্ট পিনফোল্ডও বলেন, জিসিসি দেশগুলো যুদ্ধ চায়নি এবং সামরিক পদক্ষেপ ঠেকাতে চেষ্টা করেছে। তার মতে, এখন যদি তারা যুদ্ধে জড়ায় এবং ইসরায়েলের সঙ্গে কাজ করছে—এমন ধারণা তৈরি হয়, তাহলে তাদের বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তবে নীরব থাকাও ঝুঁকিপূর্ণ। পিনফোল্ড বলেন, ইরান যদি ধারাবাহিক হামলা চালায় আর উপসাগরীয় দেশগুলো কিছু না করে, সেটিও তাদের অবস্থানের জন্য ক্ষতিকর হবে। সরকারগুলো জনমতের প্রতিও সংবেদনশীল। তারা জনগণ, ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সক্রিয়—এমন বার্তা দিতে চায়।
বিশ্লেষকদের ধারণা, উপসাগরীয় দেশগুলো শেষ পর্যন্ত পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে নিজেদের শর্তে। পিনফোল্ডের মতে, তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেওয়ার বদলে নিজেরাই, সম্ভবত যৌথভাবে, পদক্ষেপ নিতে পারে। ১৯৮৪ সালে গঠিত জিসিসির যৌথ বাহিনী ‘পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্স’, যা ২০১৩ সালে ইউনিফায়েড মিলিটারি কমান্ডে রূপ নেয়, সে ধরনের উদ্যোগের অংশ হতে পারে।
এভাবে তারা নিজেদের নেতৃত্বের অবস্থান তুলে ধরতে চাইবে, কেবল অনুসারী নয়—এমন বার্তা দিতে।
আশঙ্কার বড় কারণ
উপসাগরীয় নেতাদের তাৎক্ষণিক উদ্বেগ অবকাঠামো নিয়ে। মনিকা মার্কস বলেন, বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলাই সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এসব ছাড়া তীব্র গরম ও শুষ্ক উপসাগরীয় দেশগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে অর্থনীতিও বড় ধাক্কা খাবে।
পিনফোল্ডের মতে, শারীরিক ক্ষতির চেয়ে সুনামের ক্ষতিই দীর্ঘমেয়াদে বড় হুমকি। স্থিতিশীল ও নিরাপদ বিনিয়োগ ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে যে ভাবমূর্তি তারা গড়ে তুলেছিল, তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে।
রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্রের যুদ্ধের নতুন অধ্যায়?
বিশ্লেষকদের মতে, এ সংকট আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগে উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ ছিল ইয়েমেনের হুথি বা লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে। এখন সরাসরি রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র সংঘাতের বাস্তবতা সামনে এসেছে।
পিনফোল্ড বলেন, এটি হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অধ্যায়, অথবা পুরোনো বাস্তবতায় ফিরে যাওয়া—যেখানে সরাসরি রাষ্ট্রীয় যুদ্ধ দেখা যাচ্ছে। প্রক্সি যুদ্ধ বা পরোক্ষ লড়াইয়ের বদলে এখন সরাসরি সামরিক সংঘাত বাড়ছে।
মনিকা মার্কস বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কিছু উপসাগরীয় দেশ ইসরায়েলকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইরানের চেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই মূল্যায়ন বদলে গেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের প্রাথমিক হামলা ছিল ব্যাপক ও বিচ্ছিন্নভাবে লক্ষ্যবস্তু করা। পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
এখন উপসাগরীয় দেশগুলো দ্রুত তাদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে। তারা চায় সংঘাতের বাইরে থাকতে। তবে তাদের ঝকঝকে নগরীগুলো যখন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত, তখন সেই অবস্থান ধরে রাখা কতটা সম্ভব হবে—তা সময়ই বলবে।
উরুবা জামালের কলাম
সূত্র: আল জাজিরা
