ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে ব্যাপক তৎপরতা। উন্নয়ন, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান—এসব বিষয় জায়গা পাচ্ছে প্রায় সব দলের নির্বাচনি ইশতেহারে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই আলোচনায় শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি চোখে পড়ছে না।
সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি, রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ খাত হয়েও শিল্প ও সাহিত্য বারবার রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের বাইরে থেকে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সহিংসতা, অনুষ্ঠান বন্ধ, শিল্পীদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনা বাড়লেও নির্বাচনি ইশতেহারে এসব বিষয়ে কার্যকর নীতির প্রতিফলন নেই।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় গান, গ্রাফিতি, পথনাটক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিল্প-সংস্কৃতির ওপর হামলার চিত্র সামনে এসেছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত আগস্টের পর থেকে দেশে প্রায় দেড় হাজার ভাস্কর্য ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর হয়েছে। একাধিক সিনেপ্লেক্স, নাট্যমঞ্চ ও কনসার্ট বন্ধ বা হামলার শিকার হয়েছে।
এ ছাড়া বাউল আখড়া ভাঙচুর, শিল্পী গ্রেপ্তার, নাটক মঞ্চায়নে বাধা, নারী শিল্পী ও ক্রীড়াবিদদের অনুষ্ঠান বন্ধের ঘটনাও ঘটেছে। এসব বাস্তবতার পরও অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে শিল্পী নিরাপত্তা, সংস্কৃতিকর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা, সাহিত্য ও লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ—এই বিষয়গুলো অনুপস্থিত।
এই প্রেক্ষাপটে ব্যতিক্রম হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তাদের ইশতেহারে ঐতিহ্য রক্ষা ও স্বাস্থ্যকর বিনোদনের কথা উল্লেখ করেছে। তবে ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ বা ‘জাতীয় মূল্যবোধ’-এর স্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় বিষয়টি কতটা কার্যকর হবে—সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনি ইশতেহার শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার পরিকল্পনা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গির দলিল। সেখানে যদি শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মীদের জায়গা না থাকে, তবে গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের দাবি অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের আশঙ্কা—এই উপেক্ষা চলতে থাকলে রাষ্ট্র হয়তো অর্থনৈতিকভাবে এগোবে, কিন্তু মানবিক ও সাংস্কৃতিকভাবে আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে।
