১১ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অবশেষে সমাপ্ত পারস্যের মহাকাব্য

গতকাল (২৮ ফেব্রুয়ারি) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে “বড় সামরিক অভিযান” শুরু করেছে। তিনি ইরানের জনগণকে উদ্দেশ করে বলেন, “তোমাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে।”

অবশেষে সেই অভিযানের মধ্যেই খামেনির মৃত্যু ঘটে।

তাঁর প্রায় সাড়ে তিন দশকের নেতৃত্ব ইরানকে একদিকে আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেছে, অন্যদিকে ইরানকে আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত করতে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মুখে ফেলেছে। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন স্বাধীনতা ও প্রতিরোধের প্রতীক; সমালোচকদের কাছে কঠোর শাসক, যিনি সংস্কার ও সমঝোতার পথ সংকুচিত করেছেন।

এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইরানের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও নাটকীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো—যা অনেকের কাছে সত্যিই এক ‘পারস্যের মহাকাব্য’ বলে বিবেচিত।

রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৮৬ বছর।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, শনিবার ভোরে চালানো যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় খামেনির আবাসিক কমপ্লেক্সে আঘাত হানা হয় এবং তিনি নিহত হন।

ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম বার্তা সংস্থা জানায়, “আমেরিকা ও জায়নবাদী শাসনের যৌথ হামলায় ইসলামি বিপ্লবের নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ ইমাম সাইয়্যিদ আলী খামেনি শাহাদাত বরণ করেছেন।” রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও জানায়, হামলায় তাঁর মেয়ে, জামাতা ও নাতিও নিহত হয়েছেন।

বিপ্লব-পরবর্তী উত্থান

১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লা খোমেনরির মৃত্যুর পর খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আদর্শিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন খোমেনি, আর সেই বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্র কাঠামোকে সামরিক ও নিরাপত্তা শক্তিতে রূপ দেন খামেনি।

এর আগে ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো ইরাকের শাসক সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন দেয়। এই অভিজ্ঞতা খামেনির মনে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের প্রতি গভীর অবিশ্বাস তৈরি করে। পরবর্তী তিন দশকে তাঁর শাসনের ভিত্তি ছিল—রাষ্ট্রকে সব সময় বহিরাগত ও অভ্যন্তরীণ হুমকির বিরুদ্ধে প্রস্তুত রাখা।

তাঁর আমলে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) একটি শক্তিশালী সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে তিনি “প্রতিরোধ অর্থনীতি” নীতি গ্রহণ করেন, যাতে দেশ নিজস্ব সামর্থ্যের ওপর দাঁড়াতে পারে।

কঠিন সময় ও আন্দোলন

খামেনির শাসন নানা সময়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
২০০৯ সালে বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়, যা ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত। কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে তা দমন করা হয়।

২০১৯ সালে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদেও বড় আন্দোলন হয়।
২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নারীর অধিকার নিয়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এসব আন্দোলনে শত শত মানুষ নিহত হয়।

২০২৫ সালের শেষ দিকে মুদ্রার দরপতন ও অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে আবারও দেশব্যাপী অস্থিরতা শুরু হয়। পরিস্থিতি দমন করতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেয়।

পারমাণবিক চুক্তি ও দ্বন্দ্ব

২০১৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির আলোচনার মাধ্যমে ইরান ও বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) স্বাক্ষরিত হয়। এতে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার কথা ছিল।

কিন্তু ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন। এরপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয় এবং উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ইরান ধীরে ধীরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ায়, যদিও তারা দাবি করে—তাদের কর্মসূচি কেবল বেসামরিক উদ্দেশ্যে।

‘প্রতিরোধ অক্ষ’ নীতি

খামেনি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জন্য একটি জোট গড়ে তোলেন, যা “প্রতিরোধ অক্ষ” নামে পরিচিত। এতে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাক ও সিরিয়ার ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কিন্তু ২০২৩ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়তে থাকায় এই জোট দুর্বল হতে শুরু করে। ইসরায়েল ইরানের ঘনিষ্ঠ নেতাদের ওপর হামলা চালায়। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। পাল্টা জবাবে ইরানও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে।