স্পেনে ঘোষিত ঐতিহাসিক Regularización কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২০,০০০ অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীর পাসপোর্ট ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট প্রাপ্তিতে বিদ্যমান প্রশাসনিক জটিলতা ও দুর্নীতি নিরসনে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে ইউরোপের বহু দেশ অভিবাসন নীতি ক্রমাগত কঠোর করছে, সেখানে স্পেন সরকার একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দূরদর্শী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশটির সরকার প্রায় ৮ লাখ অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধতা প্রদানের লক্ষ্যে একটি বিশেষ অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বৈধতা অর্জনকারী অভিবাসীরা স্পেনের যেকোনো স্থানে ও যেকোনো খাতে আইনগতভাবে কাজ করার সুযোগ পাবেন।
স্পেন সরকারের এই পদক্ষেপ মূলত শ্রমবাজারের ঘাটতি পূরণ এবং ক্রমবর্ধমান বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যার প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। উল্লেখ্য, অনিয়মিত অভিবাসীদের সাধারণত দীর্ঘ সময় কঠোর শর্ত পূরণের মাধ্যমে বৈধতা অর্জন করতে হয়। তবে এই বিশেষ কর্মসূচির আওতায় তুলনামূলক সহজ ও সীমিত শর্তে আবেদন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা অত্যন্ত বিরল। সর্বশেষ প্রায় ২১ বছর আগে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল।
যোগ্যতার শর্তাবলি:
* ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের পূর্ব থেকে স্পেনে বসবাস করতে হবে
* আবেদনকালে টানা কমপক্ষে পাঁচ মাস বসবাসের প্রমাণ থাকতে হবে
* কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড থাকা যাবে না এবং জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি হওয়া যাবে না
* ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর পূর্বে আশ্রয়ের আবেদনকারী ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, ১৬ এপ্রিল ২০২৬ থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে এবং তা ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত চলবে।
নিয়মিতকরণের মাধ্যমে প্রাপ্ত সুবিধাসমূহ:
* স্পেনে বৈধভাবে বসবাসের অনুমতি
* আইনগতভাবে কাজ করার অধিকার
* পারিবারিক পুনর্মিলনের সুযোগ
* সামাজিক নিরাপত্তা ও সেবার আওতায় অন্তর্ভুক্তি
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০,০০০ বাংলাদেশি এই কর্মসূচির মাধ্যমে বৈধতা অর্জনের সম্ভাবনা রাখেন। এটি শুধু প্রবাসীদের জন্য নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈধতা অর্জনের ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, হাজারো পরিবারের জীবনমান উন্নত হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
তবে দুঃখজনকভাবে, পাসপোর্ট নবায়ন, নতুন পাসপোর্ট ইস্যু এবং পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট প্রাপ্তিতে জটিলতা এই প্রক্রিয়ার প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে বহু প্রবাসী এই গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এছাড়া, দালাল ও প্রতারক চক্রের সক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তারা প্রবাসীদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি ভুয়া নথি সরবরাহের মাধ্যমে তাদের আইনি ঝুঁকিতে ফেলছে। বহু প্রবাসী অভিযোগ করেছেন যে, পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য আবেদন করার পর বাংলাদেশস্থ সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, স্পেনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্যমতে, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রায় ১১,৫০০ আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬,৪০০টি অনলাইন এবং ৫,২০০টি অফলাইন আবেদন। এছাড়াও প্রায় ২৪০টি পাসপোর্ট আবেদন এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
বর্তমান সময়সীমা অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ উপস্থাপন করা হচ্ছে:
সুপারিশসমূহ:
১. বাংলাদেশ দূতাবাসে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর মাধ্যমে দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স প্রদান
২. স্পেন থেকে আবেদনকারীদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট ইস্যু নিশ্চিত করা
৩. প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি
৪. সংসদীয় পর্যায়ে বিষয়টি উত্থাপন করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
৫. গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
এই প্রেক্ষাপটে, স্পেন প্রবাসীদের সহায়তায় এনসিপি প্রবাসী সংকট ব্যবস্থাপনা সেল এবং এনসিপি ডায়াস্পোরা এলায়েন্স – স্পেন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা আশা প্রকাশ করছেন যে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক সুযোগকে জাতীয় স্বার্থে রূপান্তর করবে। সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হাজারো প্রবাসী পরিবারের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।