মধ্যপ্রাচ্য আবারও উত্তপ্ত। ধীরে ধীরে জমে ওঠা উত্তেজনা ২০২৬ সালে এসে যেন আগুনে পরিণত হয়েছে। শুরুটা ছিল হুঁশিয়ারি দিয়ে। জানুয়ারির ২ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরাসরি সতর্কবার্তা—ইরানে কঠোর দমননীতি হলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। এরপর আর থামেনি উত্তেজনার স্রোত।
জানুয়ারির ২৩ তারিখে ঘোষণা আসে—একটি বিশাল মার্কিন নৌবহর মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৩ ফেব্রুয়ারি, USS Gerald R. Ford সহ শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়। একই সময়ে কূটনৈতিক চেষ্টা চলছিল। ২৪ ফেব্রুয়ারি খবর আসে—জেনেভায় নতুন করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা হতে পারে। কিন্তু সেই আলোচনার আগেই বাস্তবতা বদলে যায়।
ফেব্রুয়ারি ২৮—এই দিনটিই হয়ে ওঠে টার্নিং পয়েন্ট। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসাথে ইরানের ভেতরে বড় আকারের হামলা চালায়। লক্ষ্য ছিল সামরিক ঘাঁটি, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, এবং নেতৃত্ব কাঠামো। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এক হাজারের বেশি টার্গেটে আঘাত হানা হয়। এখান থেকেই শুরু হয় নতুন যুদ্ধের অধ্যায়।
মার্চের শুরুতেই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে পুরো অঞ্চলে। ইরান পাল্টা আঘাত হানে। উপসাগরীয় এলাকায় উত্তেজনা বাড়ে। ড্রোন, মিসাইল, সমুদ্রপথ—সব জায়গায় সংঘর্ষের ছাপ। ১০ থেকে ১২ মার্চের মধ্যে হরমুজ প্রণালীর আশপাশে ট্যাংকারে হামলার খবর আসে। বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য এটি বড় সংকেত।
মার্চের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। হামলা চলতে থাকে। নতুন নতুন টার্গেট। এমনকি বেসামরিক ও শিল্প এলাকায়ও আঘাতের খবর আসে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক চাপ বাড়তে থাকে। যুদ্ধের লক্ষ্য এবং সময়সীমা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
মাসের শেষ দিকে এসে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—এই যুদ্ধ কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে? তবুও থামে না হামলা। এপ্রিলের শুরুতেও একই চিত্র। আঘাত, পাল্টা আঘাত, হুমকি আর উত্তেজনা।
আজ মধ্যপ্রাচ্য শুধু একটি সংঘাতের মধ্যে নেই। এটি এক বিস্তৃত অস্থিরতার নাম। আর সেই অস্থিরতার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো বিশ্বে।
প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে—এই আগুন শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে নিভবে?
ইরান সংঘাতের শিকড় কোথায়?
উত্তরটা আজকের না—শুরুটা অনেক পুরোনো।
১৯৭৯ সাল। এক বিপ্লব পুরো খেলাটা বদলে দেয়। ইরানের রাজা, শাহ, ক্ষমতা হারান। নতুন করে জন্ম নেয় একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র। নেতৃত্বে আয়াতুল্লাহ খোমেনি। এখান থেকেই শুরু নতুন অধ্যায়। নতুন চিন্তা। নতুন শত্রুতা।
এই বিপ্লবের পরই ঘটে আরেকটি বড় ঘটনা। তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে নেয় একদল ইরানি ছাত্র। আমেরিকানদের জিম্মি করা হয়। কয়েক মাস ধরে চলে এই সংকট। এখানেই ভেঙে যায় ইরান-আমেরিকার সম্পর্ক। বন্ধুত্ব বদলে যায় বৈরিতায়।
এরপর ১৯৮০। ইরাক আক্রমণ করে ইরানকে। শুরু হয় ভয়াবহ এক যুদ্ধ। আট বছর ধরে চলে এই সংঘাত। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। এই যুদ্ধ ইরানের মানসিকতা বদলে দেয়। নিরাপত্তা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
এই অভিজ্ঞতা থেকে ইরান নতুন কৌশল নেয়। শুধু নিজের সেনাবাহিনী নয়—তারা গড়ে তোলে শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড, উন্নত মিসাইল প্রোগ্রাম, আর বিভিন্ন মিত্র গোষ্ঠী। লেবাননে হিজবুল্লাহ, পরে গাজায় হামাস—এইসব গোষ্ঠীর মাধ্যমে ইরান তার প্রভাব বাড়াতে থাকে।
এরপরের কয়েক দশক—সংঘাত চলেছে, কিন্তু আড়ালে। সরাসরি যুদ্ধ নয়। নিষেধাজ্ঞা, গোপন অভিযান, সাইবার হামলা, প্রক্সি যুদ্ধ—এইসবের মধ্যেই লড়াই চলেছে। ইরান একদিকে, আর আমেরিকা ও ইসরায়েল অন্যদিকে।
কিন্তু ২০২৪ থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। উত্তেজনা আর লুকানো থাকেনি। ইসরায়েল ও ইরান সরাসরি হামলা-পাল্টা হামলায় জড়িয়ে পড়ে। ২০২৫ সালে সংঘাত আরও বড় হয়। আর ২০২৬-এ এসে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই যুদ্ধে যুক্ত হয়।
এখন প্রশ্ন—এই দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের কী শেখায়?
সহজ উত্তর— একটি বিপ্লব থেকে শুরু, একটি যুদ্ধ দিয়ে শক্ত হওয়া, আর দশকের পর দশক ধরে জমে থাকা দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়েই আজকের এই আগুন।
ইরান সংঘাত কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়। এটি সময়ের সাথে জমে ওঠা এক বিস্ফোরণ। আর সেই বিস্ফোরণের ধাক্কা এখন পুরো বিশ্ব অনুভব করছে।
বন্ধু থেকে শত্রু: কেন ভেঙে গেল ইরান–আমেরিকা সম্পর্ক?
একসময় ইরান আর আমেরিকা ছিল ঘনিষ্ঠ মিত্র। কিন্তু আজ তারা একে অপরের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। এই নাটকীয় পরিবর্তনের শুরু ১৯৭৯ সালে। তার আগে ইরানে ছিল শাহের শাসন, আর সেই শাহ ছিল আমেরিকার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
অনেক ইরানি মনে করত—এই সম্পর্ক তাদের দেশের স্বাধীনতাকে দুর্বল করছে। তাদের চোখে আমেরিকা ছিল এক ধরনের প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রক শক্তি। ১৯৭৯ সালে ঘটে বিপ্লব, শাহ ক্ষমতা হারান, নতুন সরকার আসে। আর সেই সঙ্গে বদলে যায় পুরো রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি।
কিন্তু আসল বিস্ফোরণ ঘটে এর কিছুদিন পর। অক্টোবর ১৯৭৯-এ শাহকে চিকিৎসার জন্য আমেরিকায় আশ্রয় দেওয়া হয়। এতে ইরানের অনেক মানুষের মনে সন্দেহ জন্মায়—আমেরিকা কি আবার শাহকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে? এই সন্দেহই মোড় নেয় বড় ঘটনার দিকে।
৪ নভেম্বর ১৯৭৯, একদল ইরানি ছাত্র তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ঢুকে পড়ে এবং আমেরিকান কূটনীতিকদের জিম্মি করে। তাদের দাবি ছিল—শাহকে ফিরিয়ে দাও, বিচার করা হোক। এই জিম্মি সংকট চলে ৪৪৪ দিন। ভাবুন—একটি সুপারপাওয়ার দেশের নাগরিকরা অন্য দেশে প্রায় দেড় বছর আটকে আছে।
এই ঘটনাটি শুধু একটি সংকট ছিল না, এটি ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। আমেরিকার জন্য এটি ছিল বড় অপমান, আর ইরানের ভেতরে তৈরি করে তীব্র anti-American মনোভাব। দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে যায়। এরপর শুরু হয় নতুন অধ্যায়—নিষেধাজ্ঞা, উত্তেজনা, সন্দেহ আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
একসময় যারা ছিল মিত্র, তারা পরিণত হয় স্থায়ী প্রতিপক্ষে। আজকের ইরান-আমেরিকা দ্বন্দ্ব বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় সেই ১৯৭৯ সালের দিকে। কারণ সেখানেই তৈরি হয়েছিল সেই ফাটল—যা আজও ভরাট হয়নি।
ইসরায়েল বনাম ইরান: কী ঘটছে আড়ালে?
সব যুদ্ধই চোখে দেখা যায় না। কিছু যুদ্ধ চলে নীরবে, ছায়ার আড়ালে। ইসরায়েল আর ইরানের লড়াই ঠিক এমনই—একটি “শ্যাডো ওয়ার”। এখানে ট্যাংক নেই, কিন্তু আঘাত আছে; ঘোষণা নেই, কিন্তু প্রতিশোধ আছে।
এই গোপন যুদ্ধের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা স্টাক্সনেট। একটি কম্পিউটার ভাইরাস, কিন্তু সাধারণ ভাইরাস নয়। এটি সরাসরি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানে, সেন্ট্রিফিউজ নষ্ট করে দেয়। একটি সফটওয়্যার—যা বাস্তব ক্ষতি করে।
এরপর আসে আরও ভয়ঙ্কর অধ্যায়। এক এক করে নিহত হতে থাকেন ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানীরা। বোমা, গুলি, রহস্যময় হামলা—ইরান সরাসরি অভিযোগ তোলে, এর পেছনে আছে ইসরায়েল। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।
এই যুদ্ধ শুধু ইরান বা ইসরায়েলের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমা দেশগুলোতেও। বিভিন্ন রিপোর্টে উঠে এসেছে—ইরান-সম্পর্কিত গোষ্ঠী বিদেশে হত্যার চেষ্টা, অপহরণ পরিকল্পনা চালিয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের ভেতরেও ধরা পড়ে গুপ্তচর নেটওয়ার্ক।
সেখানে অভিযোগ ওঠে—ইরান ভেতরে ঢুকে তথ্য সংগ্রহ করছে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরও টার্গেট করা হচ্ছে। এই পুরো সংঘাতের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো অস্বীকার করার সুযোগ। কেউ সরাসরি স্বীকার করে না, কিন্তু সবাই জানে কে করছে।
সাইবার হামলা, গুপ্তচরবৃত্তি, লক্ষ্যভিত্তিক হত্যা—সব মিলিয়ে এটি এক অদৃশ্য যুদ্ধ। বছরের পর বছর এই লড়াই আড়ালে চলেছে। ধীরে ধীরে তীব্র হয়েছে। আর এখন সেই ছায়ার যুদ্ধই ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে আলোতে।
প্রশ্ন হলো—যখন গোপন যুদ্ধ প্রকাশ্যে আসে, তখন কি তা আর নিয়ন্ত্রণে থাকে?
নতুন প্রক্সি যুদ্ধের জাল: কার ইশারায় কে লড়ছে?
এই যুদ্ধটা সরাসরি নয়। এখানে সামনে একজন, কিন্তু পেছনে আরেকজন। এটাই “প্রক্সি যুদ্ধ”। ইরান এই কৌশল বহু বছর ধরে ব্যবহার করছে—নিজে সরাসরি লড়াই না করে অন্যদের দিয়ে চাপ তৈরি করা।
এই নেটওয়ার্ককে অনেক বিশ্লেষক বলেন “Axis of Resistance”। এই জালের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হলো হিজবুল্লাহ, যার অবস্থান লেবাননে। এটি শুধু একটি মিলিশিয়া নয়—রাজনীতি, সামরিক শক্তি—সবকিছু মিলিয়ে এটি ইরানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ এবং শক্তিশালী মিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এটি একটি বড় deterrence হিসেবেও কাজ করে।
দ্বিতীয় বড় নাম হামাস, যার অবস্থান গাজায়। যদিও ধর্মীয় দিক থেকে ভিন্ন, তবুও ইসরায়েল বিরোধিতার কারণে ইরানের সাথে তাদের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তারা ইসরায়েলের ওপর সরাসরি চাপ ধরে রাখে। এই কারণেই হামাসও এই বড় আঞ্চলিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। তারা এখন শুধু স্থলভাগে নয়, সমুদ্রপথেও সক্রিয়। লোহিত সাগরে জাহাজে হামলার মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বড় প্রভাব ফেলছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের সাথে ইরানের সম্পর্ক হিজবুল্লাহর মতো গভীর নয়।
এই তিনটি গ্রুপ—লেবানন, গাজা, ইয়েমেন—তিনটি আলাদা জায়গায় অবস্থান করলেও তাদের লক্ষ্য এক—চাপ তৈরি করা। এটাই ইরানের কৌশল। একসাথে একাধিক ফ্রন্ট খুলে দেওয়া, শত্রুকে ব্যস্ত রাখা, আর নিজে কিছুটা দূরে থাকা। এই কারণেই যুদ্ধ কখনো এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না।
এক জায়গায় আঘাত করলে অন্য জায়গায় প্রতিক্রিয়া আসে। সব মিলিয়ে, এটি শুধু একটি যুদ্ধ নয়—এটি একটি জাল। যেখানে এক জায়গায় টান দিলে কম্পন ছড়িয়ে পড়ে পুরো অঞ্চলে। এখন প্রশ্ন—এই জালের শেষ কোথায়?
হামলা ও পাল্টা হামলা: শক্তি প্রদর্শনের লড়াই
এই যুদ্ধ শুধু আঘাতের নয়—এটি বার্তা দেওয়ার যুদ্ধ। কে কতটা শক্তিশালী, কে কত দ্রুত আঘাত করতে পারে—সেটাই এখানে মূল বিষয়। ইরান আর ইসরায়েলের সংঘাতে আমরা দেখি দুই ধরনের শক্তি। একদিকে সংখ্যা, অন্যদিকে প্রযুক্তি।
ইরানের শক্তি আসে তার বিশাল সেনাবাহিনী থেকে। ৬ লাখের বেশি সক্রিয় সৈন্য, হাজারের বেশি ট্যাংক, দশ হাজারের বেশি সাঁজোয়া যান। রকেট লঞ্চারের সংখ্যাও অনেক বেশি। অর্থাৎ, স্থলযুদ্ধে ইরান এক বিশাল শক্তি।
কিন্তু যুদ্ধ এখন শুধু মাটিতে সীমাবদ্ধ নয়। ইসরায়েল খেলছে অন্য এক খেলা—তাদের শক্তি আকাশে। আধুনিক F-35 যুদ্ধবিমান, নির্ভুল হামলার প্রযুক্তি, আর দ্রুত টার্গেট শনাক্ত করার সক্ষমতা। মুহূর্তেই আঘাত হানার ক্ষমতাই তাদের বড় শক্তি।
২০২৫ সালের সংঘর্ষে এই পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসরায়েল আকাশপথে দ্রুত ও নির্ভুল হামলা চালায়। অন্যদিকে, ইরান পাল্টা জবাব দেয় মিসাইল আর ড্রোন দিয়ে। এটি এক ধরনের “power signaling”—মানে, আমি আঘাত করতে পারি, তুমি কী করতে পারো?
ইসরায়েল দেখাতে চায়—তারা প্রযুক্তিতে এগিয়ে, দূর থেকে সুনির্দিষ্ট আঘাত করতে পারে। আর ইরান দেখাতে চায়—তারা থামবে না, তাদের কাছে আছে বিপুল মিসাইল, তারা একসাথে বহু জায়গায় চাপ তৈরি করতে পারে। এখানে আরেকটি বড় পার্থক্য—সমর্থন।
ইসরায়েল পায় যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সহায়তা, যা তাদের প্রযুক্তিকে আরও এগিয়ে দেয়। অন্যদিকে, ইরান ভরসা করে তার নিজস্ব কৌশলে—সংখ্যা, মিসাইল, আর আঞ্চলিক প্রভাব। সব মিলিয়ে, এই সংঘাত সরাসরি জয়-পরাজয়ের নয়।
এটি শক্তি দেখানোর লড়াই। একজন দেখায়—কত নিখুঁত আঘাত করতে পারে। আরেকজন দেখায়—কত বড় চাপ তৈরি করতে পারে। প্রশ্ন এখন—এই শক্তির প্রদর্শন শেষ পর্যন্ত কি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে?
শক্তির লড়াইয়ে কে এগিয়ে
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কে জিতছে? কিন্তু উত্তরটা এত সহজ না। প্রথমেই দেখা যাক আকাশের দখল। যুদ্ধ শুরুর প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দেয়।
শত শত টার্গেটে আঘাত, ৩০টির বেশি প্রদেশে হামলা—ফলাফল, ইরানের আকাশে কার্যত তাদের আধিপত্য। এই জায়গায় এগিয়ে আছে ইউএস–ইসরায়েল জোট। তারা আঘাত করছে, এবং সেটা নির্ভুলভাবে।
কিন্তু যুদ্ধ শুধু আকাশে হয় না। ইরান দেখাচ্ছে অন্য রকম শক্তি—মিসাইল আর ড্রোন দিয়ে একটার পর একটা পাল্টা আঘাত। গালফ অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে চাপ তৈরি হচ্ছে।
যদিও অনেক হামলাই প্রতিহত হচ্ছে, তবুও পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না। এখানেই আসে আরেকটি বড় ফ্যাক্টর—হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল রুট, যা কার্যত নিয়ন্ত্রণে রেখেছে ইরান।
ফলে বিশ্ববাজারে তৈরি হচ্ছে চাপ। এটি ইরানের বড় কৌশলগত শক্তি। এবার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব—ইরানের ভেতরে হাজার হাজার হামলা, সামরিক ঘাঁটি, মিসাইল ফ্যাক্টরি, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত, হাজারের বেশি মানুষ নিহত।
অন্যদিকে, ইসরায়েল ও গালফ অঞ্চলেও হামলা হয়েছে—প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, তবে তুলনামূলকভাবে কম। তাহলে চিত্রটা কী দাঁড়ায়?
ট্যাকটিক্যালি—ইউএস ও ইসরায়েল এগিয়ে। তাদের প্রযুক্তি, আকাশ নিয়ন্ত্রণ, নির্ভুল হামলা—সব শক্তিশালী। কিন্তু স্ট্র্যাটেজিকভাবে—ইরান এখনো খেলার বাইরে যায়নি।
তারা চাপ তৈরি করছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। অর্থাৎ, এটি একপাক্ষিক জয় না, এটি অসম লড়াই। একদিকে নিখুঁত আঘাত, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী চাপ।
এই দুই শক্তির সংঘর্ষে শেষ পর্যন্ত কার কৌশল টিকবে?
ইরানের ধোঁয়ায় ছেয়েছে বিশ্ব: পুড়ছে হরমুজ, ছাই হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি
এই যুদ্ধ শুধু বোমা আর মিসাইলের নয়—এটি অর্থনীতির যুদ্ধ। যেখানে আগুন লাগে এক দেশে, আর ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে পুরো পৃথিবীতে। ইরান সংঘাত শুরু হতেই তেলের বাজারে বড় ধাক্কা লাগে।
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম লাফিয়ে উঠে ১০–১৫ শতাংশ। ৮০ ডলার থেকে ১১০, তারপর ১২০—বিশ্ব বাজার যেন দিশেহারা। কারণটা একটাই—হরমুজ প্রণালী।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়ে যায়। আর সেই পথ কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। ফলে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন—এটি হতে পারে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ ব্যাঘাত।
কিন্তু সমস্যা এখানেই শেষ নয়। আরেকটি বড় ধাক্কা আসে লোহিত সাগর থেকে। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা জাহাজে হামলা শুরু করে, ফলে বিশ্ব বাণিজ্য প্রায় থমকে যায়।
কন্টেইনার ট্রাফিক কমে যায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত। বড় বড় কোম্পানি বাধ্য হয় আফ্রিকা ঘুরে যেতে। এতে সময় বাড়ে ১০ থেকে ১৪ দিন, আর খরচ বাড়ে কয়েকগুণ।
একদিকে তেলের সংকট, অন্যদিকে পণ্য পরিবহনের জট—দুই দিক থেকে চাপ পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে। স্টক মার্কেট পড়ে যায়, মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে শুরু করে, বিশ্বজুড়ে দেখা দেয় সরবরাহ সংকট।
অনেকে এটিকে বলছেন—“global economic shock”। এখন প্রশ্ন—এই আগুন কোথায় গিয়ে থামবে? কারণ হরমুজ যদি বন্ধ থাকে, আর লোহিত সাগর যদি অস্থির থাকে, তাহলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে।
এই যুদ্ধ তাই আর আঞ্চলিক নেই। এটি এখন বৈশ্বিক সংকট। আর সেই সংকটের কেন্দ্রবিন্দু—একটি সরু জলপথ, যার নাম—হরমুজ।

বড় শক্তিগুলোর খেলা: আমেরিকা, রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা
এই যুদ্ধ শুধু ইরান আর ইসরায়েলের নয়। এটি বড় শক্তিগুলোর খেলা। একটা শাপলুডু—যেখানে কেউ সরাসরি নামে, আর কেউ দূর থেকে চাল দেয়। এই খেলায় সবচেয়ে সামনে আছে আমেরিকা।
ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে সরাসরি হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আকাশপথে আঘাত, নৌবাহিনীর উপস্থিতি—সব মিলিয়ে যুদ্ধের মূল চালক এখন ওয়াশিংটন। লক্ষ্য পরিষ্কার—ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল করা এবং পারমাণবিক হুমকি ঠেকানো।
কিন্তু এই যুদ্ধের একটা বড় মূল্যও আছে। বিলিয়ন ডলার খরচ, বিশাল সেনা মোতায়েন, আর সবচেয়ে বড়—মনোযোগ সরে যাচ্ছে অন্য জায়গা থেকে। ইউক্রেন, এশিয়া—সব জায়গায় চাপ বাড়ছে।
এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে রাশিয়া। রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে নামছে না, কিন্তু আড়ালে সহায়তা দিচ্ছে। তথ্য, গোয়েন্দা সহায়তা, প্রযুক্তি—সবই পৌঁছে যাচ্ছে ইরানের কাছে।
তাদের লক্ষ্য একটাই—যুদ্ধটা দীর্ঘায়িত করা। কারণ যুদ্ধ যত লম্বা হবে, ততই ব্যস্ত থাকবে আমেরিকা। আর ততই স্বস্তি পাবে রাশিয়া—বিশেষ করে ইউক্রেন ইস্যুতে।
আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়—চীন। চীন অনেকটাই নীরব, কিন্তু এই নীরবতাও এক ধরনের কৌশল। একদিকে তারা শান্তির কথা বলছে, অন্যদিকে ইরানের তেল কিনে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে।
এতে চীনের লাভ কী? সহজ—আমেরিকা যত বেশি মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত থাকবে, চীন তত বেশি স্বাধীনভাবে এশিয়ায় তার প্রভাব বাড়াতে পারবে। অর্থাৎ, সরাসরি যুদ্ধে না নেমেও তারা লাভবান হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এই যুদ্ধ শুধু বোমা আর মিসাইলের না। এটি বড় শক্তিগুলোর হিসাব-নিকাশ। একজন সরাসরি লড়ছে, আরেকজন আড়ালে সাহায্য করছে, আরেকজন অপেক্ষা করছে সঠিক সময়ের।
এই শাপলুডুর খেলায় শেষ পর্যন্ত কে সাপের মুখে পড়বে, আর কে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠবে?
কোথায় দাঁড়াবে পৃথিবী? অবশ্যম্ভাবী ভবিষ্যতের ছায়াচিত্র
কোথায় থামবে এই যুদ্ধ? প্রতিবেদকের চোখে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চিত্র
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে শেষটা কেমন হবে—তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের মতে, সামনে কয়েকটি সম্ভাব্য পথ তৈরি হচ্ছে।
একটি সম্ভাবনা হলো দ্রুত সামরিক সমাপ্তি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি তাদের আকাশ ও প্রযুক্তিগত আধিপত্য ধরে রাখতে পারে, তাহলে তারা ইরানের সামরিক কাঠামোকে আরও দুর্বল করতে পারে। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, এতে ইরানের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনও ঘটতে পারে। তবে এই ধরনের ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করছে যুদ্ধ কত দ্রুত শেষ হয় তার ওপর।
অন্যদিকে, কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল থেকে ইতিমধ্যে আলোচনার আহ্বান এসেছে। এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে ইরান তার কিছু সামরিক কর্মসূচি সীমিত করবে এবং বিনিময়ে হামলা কমবে। এতে সংঘাত সাময়িকভাবে থামতে পারে।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, সবচেয়ে বাস্তব চিত্র হলো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। ইরান তার মিসাইল, ড্রোন এবং আঞ্চলিক মিত্রদের ব্যবহার করে সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। এতে সরাসরি বড় জয় কারও না হলেও, উভয় পক্ষই ধীরে ধীরে ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়বে। এই পরিস্থিতিতে তেলের বাজার অস্থির থাকবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে।
আরেকটি উদ্বেগজনক সম্ভাবনা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা। যদি ইরানের ভেতরে রাজনৈতিক বা সামরিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে দেশটি বড় ধরনের অস্থিরতার দিকে যেতে পারে। কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করছেন, এতে পুরো অঞ্চল আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।
বিশ্লেষকদের একটি সাধারণ মন্তব্য হলো—এই সংঘাতের কোনো সহজ সমাধান নেই। যুদ্ধ শেষ হলেও তার প্রভাব দীর্ঘদিন থাকবে। মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করছে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই যুদ্ধ কি দ্রুত থামবে, নাকি ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘ সংকটে রূপ নেবে?
উত্তর এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথ।