৬ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

প্রবাস থেকে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করার অনন্য নজির

ঈদুল আজহা শুধু কুরবানির আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি ত্যাগ, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ভাগাভাগি করার এক অনন্য শিক্ষা। নিজের আনন্দকে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত। আর সেই সৌন্দর্যকেই বাস্তবে রূপ দিলেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ডা. মো. আবদুল মোহাইমিন (সাইমন)।

হাজার হাজার মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও তাঁর হৃদয় পড়ে আছে নিজ জন্মভূমি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার পীর কাশিমপুর গ্রামে। ঈদের আনন্দ যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন গ্রামের যেসব পরিবার নানা কারণে এ বছর কুরবানি দিতে পারেনি, তাঁদের কথা ভেবেছেন তিনি। সেই চিন্তা থেকেই গ্রামের অসচ্ছল ও কুরবানিবঞ্চিত মানুষের জন্য কুরবানির আয়োজন করেন ডা. সাইমন।

ঈদের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার সকালে পীর কাশিমপুর গ্রামে কুরবানির কার্যক্রম শুরু হয়। পরে জুমার নামাজের আগেই গ্রামের বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে কুরবানির মাংস বিতরণ সম্পন্ন করা হয়। প্রবাসে অবস্থান করলেও পুরো কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপ ছিল তাঁর সার্বক্ষণিক তদারকিতে।

ডা. মো. আবদুল মোহাইমিন (সাইমন) বলেন, “ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা নিজের পরিবারকে ছাড়িয়ে সমাজের মানুষের মাঝেও ছড়িয়ে দেওয়া যায়। সামর্থ্য অনুযায়ী নিজের গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতেও সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে আরও বেশি সম্পৃক্ত রাখতে চাই।”

এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। তাঁর কাকা, ফুফা এবং কাজিন রিফাত ও রনি মাঠপর্যায়ে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ডা. সাইমন বলেন, “তাঁদের আন্তরিক সহযোগিতা ও সদিচ্ছা ছাড়া দূর আমেরিকায় বসে এই উদ্যোগ সফল করা সম্ভব হতো না।”

ডা. মো. আবদুল মোহাইমিন (সাইমন) পীর কাশিমপুর গ্রামের মরহুম আবদুর রউফের একমাত্র পুত্র। তাঁর পিতা ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী ও আদর্শবান মানুষ। বিএসসি ও বিএড ডিগ্রিধারী এই শিক্ষাবিদ জাঙ্গালিয়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রায় তিন দশক প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষকতা জীবনে তিনি যেমন শিক্ষার্থীদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন, তেমনি সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও ছিলেন সক্রিয়।

পিতার সেই শিক্ষা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার আদর্শ ধারণ করেই আজ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তাঁর সন্তান। প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা ও দূরত্ব তাঁকে নিজের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। বরং নিজ গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, ভৌগোলিক দূরত্ব কখনো মানবিক সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি করতে পারে না।

সমাজ পরিবর্তনের বড় বড় গল্প অনেক সময় ছোট ছোট উদ্যোগ থেকেই শুরু হয়। পীর কাশিমপুর গ্রামের এই কুরবানির আয়োজন হয়তো জাতীয় পরিসরে বড় কোনো ঘটনা নয়, কিন্তু এটি মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এমন উদ্যোগই সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করে।

ঈদের প্রকৃত শিক্ষা হলো ত্যাগ ও ভাগাভাগি। আর সেই শিক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে ডা. মো. আবদুল মোহাইমিন (সাইমন) প্রমাণ করেছেন, প্রবাসে থেকেও নিজের মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব—যদি থাকে আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা।