ছবি: অনলাইন থেকে
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির প্রধান গন্তব্য ছিল মধ্যপ্রাচ্য, যেখানে এখনো দেশের প্রবাসী শ্রমিকদের বড় একটি অংশ কর্মরত। বর্তমানে মোট প্রবাসী কর্মীর প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই এই অঞ্চলে কাজ করছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে বারবার যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা—বিশেষ করে ইরান, আমেরিকা এবং ইজরাইল সম্পর্কিত সংঘাত—বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার এখন বিকল্প শ্রমবাজার হিসেবে ইউরোপের দিকে নজর দিচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তুলনামূলক স্থিতিশীল ইউরোপীয় দেশগুলোতে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে প্রায় ২০ লাখ কর্মী ইউরোপে পাঠানো সম্ভব হতে পারে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশগামী ১১ লাখ ১৬ হাজার ৩৯৯ কর্মীর মধ্যে প্রায় ৮২.৪ শতাংশই গেছেন মধ্যপ্রাচ্যের গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি)ভুক্ত দেশগুলোতে। এর মধ্যে সৌদি আরব একাই প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কর্মীর গন্তব্য। একই সঙ্গে মোট রেমিট্যান্সের ৬০ শতাংশের বেশি আসে এই অঞ্চল থেকে, যা একমুখী নির্ভরতার ঝুঁকিকে স্পষ্ট করে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইউরোপের অন্তত এক ডজন দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ইতালি, ফ্রান্স, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, গ্রিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া, পর্তুগাল, ব্রাজিল, রাশিয়া, মাল্টা, স্পেন, অস্ট্রিয়া, আলবানিয়া । এসব দেশে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা থাকায় বাংলাদেশ সরকার এই সুযোগ কাজে লাগাতে চায়।
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, ইউরোপের দেশগুলোতে কর্মী পাঠাতে হলে ভাষাগত দক্ষতা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে দেশের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণ জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে বৈধ প্রক্রিয়ায় অভিবাসনে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বর্তমানে ইউরোপমুখী অভিবাসনের হার এখনও তুলনামূলকভাবে কম। মোট বিদেশগামী কর্মীদের মধ্যে মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ ইউরোপে যাচ্ছেন। ২০২৪ সালে বিদেশে যাওয়া ১০ লাখের বেশি কর্মীর মধ্যে মাত্র ১৬ হাজারের কিছু বেশি ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিসা জটিলতা, দক্ষতার ঘাটতি, এজেন্সি ও সরকারি সমন্বয়ের অভাব এবং অভিবাসীদের আচরণগত সমস্যার কারণে ইউরোপের সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা একটি নন-শেনজেন দেশে গিয়ে সেখান থেকেশেনজেন ভুক্ত দেশে প্রবেশ করেন, যা বাংলাদেশের শ্রমিকদের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপে দক্ষ শ্রমবাজার তৈরি করা এখন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।